Magura ০৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ : কায়েদ সাহেব (রহ.)

Reporter Name
  • Update Time : ০৫:১৯:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬
  • / 19

আল্লামা আযীযুর রহমান নেছারাবাদী, যিনি কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.) নামে সর্বাধিক পরিচিত, ১৯১৩ সালে ঝালকাঠীর বাসন্ডা (বর্তমান নেছারাবাদ) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, যিনি আমৃত্যু দেশ, সমাজ ও জাতির খেদমতে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।

তার কর্মজীবনের সূচনা হয় শিক্ষকতার মহান পেশার মাধ্যমে। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আদর্শিক দীক্ষায় অসংখ্য শিক্ষার্থী গড়ে ওঠেন, যারা পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মরহুম ড. মু. মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. আ. র. ম আলী হায়দার মুর্শিদী, প্রফেসর এমএ মালেক, ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রব খান, মরহুম মাওলানা মো. আমজাদ হোসাইন, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক অধ্যাপক আখতার ফারুক, দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা কবি রুহুল আমীন খান এবং ইসলামি সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি মাওলানা শামসুদ্দিন প্রমুখ।

শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি। দক্ষিণাঞ্চলের আনাচে-কানাচে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে পশ্চাৎপদ নারী সমাজের শিক্ষার প্রসারেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কামিল মাদরাসাকে তিনি বহুমুখী শিক্ষা কমপ্লেক্সে রূপ দেন, যার আওতায় ৪২টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার প্রতিষ্ঠিত ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা আজও দেশের অন্যতম আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

কায়েদ সাহেব (রহ.) ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ তার কাছে মর্যাদা পেতেন। ঝালকাঠী অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও তাকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। তিনি যখন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন ঝালকাঠীর বিভিন্ন মন্দিরে তার সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল।

তিনি ছিলেন উদার মননের মানুষ। ভালো বিষয় যেকোনো উৎস থেকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্রষ্টাভক্তিমূলক গান তিনি নিজেও গাইতেন। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ক্যাসেট তৈরি করে শুনতেন এবং প্রচারের নির্দেশ দিতেন। নকুল কুমার বিশ্বাসের সমাজসংস্কারমূলক গানও তার পছন্দের তালিকায় ছিল।

তিনি ছিলেন কর্মবীর ও আত্মনির্ভরতার প্রবক্তা। মানুষকে কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন, বেকারদের ব্যবসা শুরু করতে নিজ অর্থে সহায়তা দিতেন। তার মুখে প্রায়ই উচ্চারিত হতো—“ওগো মুসলমানের ছেলে, কাজ করিলে মান যাবে তোর কোন হাদিসে পেলে?”

এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুসংবাদে সারা দেশ থেকে লাখো মানুষ ঝালকাঠীর নেছারাবাদে ছুটে আসেন। তার জানাজায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে, যা প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

তিনি চলে গেলেও শিক্ষা, মানবসেবা ও কর্মপ্রেরণার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম

Please Share This Post in Your Social Media

ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ : কায়েদ সাহেব (রহ.)

Update Time : ০৫:১৯:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

আল্লামা আযীযুর রহমান নেছারাবাদী, যিনি কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.) নামে সর্বাধিক পরিচিত, ১৯১৩ সালে ঝালকাঠীর বাসন্ডা (বর্তমান নেছারাবাদ) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, যিনি আমৃত্যু দেশ, সমাজ ও জাতির খেদমতে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন।

তার কর্মজীবনের সূচনা হয় শিক্ষকতার মহান পেশার মাধ্যমে। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক ও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আদর্শিক দীক্ষায় অসংখ্য শিক্ষার্থী গড়ে ওঠেন, যারা পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মরহুম ড. মু. মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. আ. র. ম আলী হায়দার মুর্শিদী, প্রফেসর এমএ মালেক, ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রব খান, মরহুম মাওলানা মো. আমজাদ হোসাইন, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক অধ্যাপক আখতার ফারুক, দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা কবি রুহুল আমীন খান এবং ইসলামি সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি মাওলানা শামসুদ্দিন প্রমুখ।

শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি। দক্ষিণাঞ্চলের আনাচে-কানাচে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে পশ্চাৎপদ নারী সমাজের শিক্ষার প্রসারেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কামিল মাদরাসাকে তিনি বহুমুখী শিক্ষা কমপ্লেক্সে রূপ দেন, যার আওতায় ৪২টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার প্রতিষ্ঠিত ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা আজও দেশের অন্যতম আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।

কায়েদ সাহেব (রহ.) ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ তার কাছে মর্যাদা পেতেন। ঝালকাঠী অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও তাকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। তিনি যখন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন ঝালকাঠীর বিভিন্ন মন্দিরে তার সুস্থতার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল।

তিনি ছিলেন উদার মননের মানুষ। ভালো বিষয় যেকোনো উৎস থেকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্রষ্টাভক্তিমূলক গান তিনি নিজেও গাইতেন। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ক্যাসেট তৈরি করে শুনতেন এবং প্রচারের নির্দেশ দিতেন। নকুল কুমার বিশ্বাসের সমাজসংস্কারমূলক গানও তার পছন্দের তালিকায় ছিল।

তিনি ছিলেন কর্মবীর ও আত্মনির্ভরতার প্রবক্তা। মানুষকে কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন, বেকারদের ব্যবসা শুরু করতে নিজ অর্থে সহায়তা দিতেন। তার মুখে প্রায়ই উচ্চারিত হতো—“ওগো মুসলমানের ছেলে, কাজ করিলে মান যাবে তোর কোন হাদিসে পেলে?”

এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুসংবাদে সারা দেশ থেকে লাখো মানুষ ঝালকাঠীর নেছারাবাদে ছুটে আসেন। তার জানাজায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে, যা প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

তিনি চলে গেলেও শিক্ষা, মানবসেবা ও কর্মপ্রেরণার যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম